করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রশাসনের কয়েকটি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং আইনশৃংখলারক্ষাকারী বাহিনী সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন। তার মধ্যে কাজের দক্ষতা এবং সততা দিয়ে কোন কোন মন্ত্রণালয় বা বাহিনী প্রশংসা কুড়ালেও অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশবাসী। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয়কে এই দূর্যোগকালীন সময়ে তাদের কার্যক্রম প্রদর্শন করতে দেখা যায়নি। তবে সবচেয়ে বেশী নজরকেড়েছে এবং প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশবাহিনী পক্ষান্তরে সবচেয়ে বাজে অবস্থা দেখাগেছে স্বাস্থ্যখাতে।

সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে প্রথমদিকে ডাক্তাররা মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা ঘোষনা করলে তাদের সেবা কার্যক্রম চালু হয় কিন্তু করোনারোগীদের সেবার জন্য অন্য রোগীদের সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় দেশের সাধারন মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। যে কোন চিকিৎসা গ্রহণের পূর্বে করোনা টেস্টের বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়ায় অনেক মুমূর্ষরোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক ডাক্তাররা করোনা টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে নয় ছয় করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তারমধ্যেও আশার খবর হলো ডাক্তাররা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সাধারন মানুষের মধ্যে তাদের জন্য সহানুভূতি এবং ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে। এযুদ্ধে প্রথম শহীদ হয়েছেন একজন ডাক্তার। ইতোমধ্যে বেশকয়েকজন ডাক্তার মৃত্যুবরণ করেছেন এবং কয়েক হাজার ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ডাক্তাররা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও বির্তকিত কর্মকান্ডের জন্য বিশ্বব্যাপী আলোচনা সমালোচনায় রয়েছে সরকারের স্বাস্থ্যখাত। মেয়াদউত্তীর্ণ হাসপাতালের সাথে করোনাচিকিৎসার জন্য চুক্তি করা, টেস্টছাড়া রিপোর্ট প্রদান করা, লাইসেন্সবিহীন এনজিওর সাথে চুক্তি করা, নকল পিপিই সরবরাহ সহ নানা কেলেংকারীতে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন। ইতোমধ্যে নানা অনিয়ম আর কেলেংকারী মাথায় নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদত্যাগ করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল পর্যন্ত সংগঠিত হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে বিভিন্ন মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবায় জড়িতদের থাকা খাওয়া বাবাদ আকাশচুম্বি বিল ভাউচার জমা দেওয়ায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারী হাসপাতালগুলো চিকিৎসার নামে গলাকাটা বিল ধরিয়ে দিলেও মন্ত্রণালয় কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করোনায় আক্রান্ত হয়ে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসাগ্রহণ না করে সিএমএইচে ভর্তি হয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতের আসলচিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। সবকিছু দেখে এবং বুঝে সবদায়দায়িত্ব অস্বকীর করে ভাঁড়ে পরিনত হয়েছেন মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বর্তমান মন্ত্রীপরিষদে তিনিই একমাত্র মন্ত্রী যার পদত্যাগের দাবী তুলেছেন সরকার এবং বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা।

করোনাকালীন সময়ে রাজপথে থেকে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে সবচেয়ে বেশী নজর কেড়েছেন পুলিশবাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ থাকলেও করোনাকালীন সময়ে তাদের সেবা এবং কার্যক্রম বেশ প্রশংসার দাবী রাখে। তারা দেশের মানুষকে সচেতন করা, সহযোগীতা করা সহ রাস্তায় থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সরকারি ত্রান নিয়ে প্রথমদিকে দুর্নীতি হলেও পরবর্তীতে পুলিশবাহিনীর তৎপরতায় বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি গ্রেফতার হলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দেশের মানুষ যখন লকডাউনে ঘরে নিরাপদে অবস্থান করেছেন তখন পুলিশবাহিনী রাস্তায় থেকে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করে গেছেন। তাদের অব্যাহত যুদ্ধে অনেক পুুলিশসদস্য শাহীদ হয়েছেন। করোনাকালীন সময়ে দেশের আইনশৃংখলা বজায় রাখা তাদের জন্য নিঃসন্দেহে প্রশাংসার দাবী রাখে। পুলিশবাহিনীর তৎপরতায় প্রথমদিকে বিদেশফেরত মানুষদেরকে হোমকোয়ারাইন্টানে রাখার ফলে সংক্রমণের হার কম ছিলো ফলে দেশ ভয়াবহ মহামারীর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। বলা যায় পুলিশবাহিনী বহুদিনপরে তাদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরে ফেতে সক্ষম হয়েছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে হতাশ হয়েছেন দেশবাসী। করোনারসময়ে পিয়াজ, আদা সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম হু হু করে বাড়লেও নিশ্চুপ ছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থাকায় দেশবাসী বাণিজ্যমন্ত্রীর নাম পর্যন্ত ভুলতে বসেছে। দেশের উল্লেখযোগ্যসংখক মানুষ যখন চাকরি হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন তখন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলছে বিষদময়। জনমুখে প্রচলিত আছে বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় একজন ব্যবসায়ী হওয়ায় তিনি সাধারণত ব্যবসায়ীদের পক্ষেই অবস্থান করে থাকেন। সাধারণ মানুষের কথা তিনি খুবই কম চিন্তা করেন। এভাবে চলতে থাকলে করোনার চেয়ে বেশী মানুষ মারা যাবে না খেয়ে।

শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে ক্লাসের ব্যবস্থা করে আলোচনায় এসেছে শিক্ষামন্ত্রণালয় কিন্তু অনলাইনে শিক্ষার নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাটের খবরে ব্যথিত হয়েছেন দেশবাসী । অনলাইনে শিক্ষার মাধ্যমে ধনীকশ্রেণীর মানুষের শিক্ষাব্যবস্থা অব্যাহত থাকলেও গরীব শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বিপাকে। অনলাইনে ক্লাস করার মতো প্রয়োজনীয় মোবাইল বা কম্পিউটার না থাকায় শতকরা প্রায় পচাঁত্তর শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষাকার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত বা নি¤œবিত্ত মানুষের পক্ষে এইমুহুর্তে সম্ভব নয় শিক্ষার পিছনে বিনিয়োগ করা। ইতোমধ্যে দেশের অনেক বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অর্থ অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী চলতি বছরে প্রাথমিক সমাপনী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে ফলে ভেঙ্গে পড়বে শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের উচিৎ শিক্ষাখাতে প্রণোদনা দিয়ে বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা। মেসভাড়া বাকি থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে পড়তে হয়েছে বিড়ম্বণায়। অনেক শিক্ষার্থী বিভাগীয় এবং জেলা শহর ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন গ্রামের পথে । এইচএসসি পরীক্ষা সহ অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষার সময় নির্ধারণ না করায় শিক্ষার্থীরা মনোনিবেশ করতে পারছেনা বইয়ের পাতায়। শিক্ষার্থীদের মানসিকস্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য মন্ত্রণালয়ের উচিৎ টেলিভিশনের মাধ্যমে শিক্ষণীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করা যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আনন্দ এবং শিক্ষা দুটোই পেতে পারে। তবে ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়া নিঃসন্দেহে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বড় উদ্দ্যোগ।

করোনাকালীন সময়ে দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশী সময় ব্যয় করছেন অনলাইনে। গেম খেলা, ভিডিও দেখা, সামাজিক নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা, অনলাইনে কথা বলা, ক্লাশ করা সহ নানা কাজে যুক্ত আছেন। সংসারের দৈন্দিন ব্যয়ের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে নেটের ব্যয়। উচ্চমূল্যের নেট কিনতে হয়েছে দেশবাসীর। মন্ত্রণালয়ের উচিৎ ছিলো নেটের মূল্য নির্ধরণ করে দেওয়া। করোনাকে পুঁজিকরে দেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবসায়ীরা লুটে নিয়েছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। ডিজিটাল বাংলাদেশের মানুষকে চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে ডিজিটাল জীবনযাপনের জন্য। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিৎ অনলাইনে ক্লাস করার জন্য শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে নেটের ডাটা সরবরাহ করা।

ধর্মান্ধ বাংলাদেশে ধর্মমন্ত্রণালয় প্রথম থেকেই করোনাভাইরাস মোকাবেলা করার জন্য মসজিদের ইমাম এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাজে লাগালে আরো ফলপ্রসুত হতো। মসজিদে নামাজ বন্ধ করার পূর্বে প্রতিটি মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে মুসল্লিদেরকে নামাজ বন্ধের কারন আগেই জানাতে পারলে সরকার সম্পর্কে জনমনে ধর্মনিয়ে আশংকার সৃষ্টি হতো না। তবে সরকার করোনাকালে মসজিদের ইমাম এবং মুয়াজ্জিনদের পাশে আর্থিক সহযোগীতা নিয়ে দাড়িয়ে বড় ভালো কাজ করেছেন।

করোনাভাইরাসের কারনে দেশে ফেরত আসা কয়েকলক্ষ প্রবাসী শ্রমিকদেরকে তাদের কর্মসংস্থানে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। প্রবাসী শ্রমিকদের বেতনের টাকার উপর আমাদের জিডিপি উঠানামা করে থাকে। সময় মতো তাদেরকে তাদের কর্মস্থলে যোগদান করানোর ব্যবস্থা না করতে পারলে বেকার হয়ে যাবে কয়েকলক্ষ প্রবাসী শ্রমিক ফলে জিডিপি কমে যাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়বে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচিৎ হবে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য দ্রæত করোনাপরীক্ষার ব্যবস্থা করে প্রয়োজনে বিশেষ ফ্লাইটে সংশ্লিষ্ট দেশে পৌছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কুটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। করোনা পরবর্তীতে নতুন বিশ্বে কুটনৈতিক তৎপরতা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হবে কারন নতুন বিশ্বে নতুন মেরুকরণ হবে। এই মেরুকরণে ভেবে চিন্তে যোগদান করতে হবে। করোনাভাইরাসের টিকা আবিস্কার হলে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য টিকা নিশ্চিত করার জন্য প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে হবে। দেশের মানুষ এবং দেশের অর্থনীতির জন্য এইদুটি মন্ত্রণালয়কে এখনই সাহসী উদ্দ্যোগ গ্রহণ করতে হবে না হলে চরম মূল্য দিতে হবে দেশ এবং দেশের মানুষকে।

দেশের মানুষ জীবন এবং জীবিকার জন্য কর্মক্ষেত্রে নেমে পড়েছেন। অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস মোকাবেলার কার্যক্রম ফলে একটু অসচেতনায় ঘটে যেতে পারে বড় ধরণের দূর্ঘটনা তাই সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরকে নজর রাখতে হবে কার্যক্রমের উপর। আলোচিত সমালোচিত মন্ত্রণালয়কে তাদের ভাবমূর্তি উদ্ধার করার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কর্মদক্ষতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বর কারনে অনেক মন্ত্রী মহোদয়েরা অপকর্ম করেও পার পেয়েগেছেন। করোনামোকাবেলায় সাধারণ জনগনের পাশে তাঁর এবং তাঁর সরকারের দাঁড়ানোকে জনগন স্বতঃস্ফুর্তভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর কর্মকান্ডের কারণে বিশ্বমিডিয়ায় স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর এই অর্জণ অনেকেই বর্জণে রুপান্তরিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এবিষয়ে সর্তক দৃষ্টি রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি।

করোনাকালীন সময় পার করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে তবেই গড়ে উঠবে সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : মোঃ হেদায়েত উল্লাহ তুর্কী
সহকারী রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়