ছকে বাঁধা জীবনে কেউ কেউ বড্ড হাঁপিয়ে ওঠে। নিজের পছন্দসই জীবন সাজাতে না পারার আপসোস রয়েই যায়। তাই নয়টা পাঁচটার জীবনে সাফল্য থাকলেও মন যেন খুঁজে চলে অন্য কোনো কিছু। একান্তই নিজের কিছু। সেই ভাবনা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মোরশেদা মৌরী। তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা, স্বপ্ন দেখেন কীভাবে নারীদের কে আরো উন্নত করা যায় এবং সফলতার মুখ দেখানো যায়। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করার পর চাকরি করেছেন শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের বিবিএ লেকচারার হিসেবে। ট্রেনিং দিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশকেও।

২০১৭ সালে সন্তান হবার পর সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য চাকরি ছেড়েছেন তিনি। বুঝতে পারেন সংসার-সন্তান সামলে বাসার বাইরে গিয়ে চাকরি করা তার পক্ষে আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। কিন্তু মনে মনে একটা কিছু করার খুব ইচ্ছে অনবরত নাড়া দিতে থাকে। মৌরী ভাবেন তার মতো অনেক শিক্ষিত মা ই আছেন যারা সন্তানের যত্ন নিতে অথবা বিভিন্ন পারিবারিক কারণে চাকরি ছেড়েছেন। এই বৃহৎ শিক্ষিত বেকার নারী সমাজকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেই চিন্তাই নিয়মিত তার মাথায় ঘুরপাক খায়।

আগে থেকেই ফ্রিল্যান্সিং জানা থাকায় তিনি গড়ে তোলেন নারীদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গিগস্ । যেখানে প্রথমে কাজ শেখানো হয় এবং পরে মার্কেটপ্লেসে তাদেরকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একে একে গড়ে তুললেন ফুড ম্যাগাজিন বাংলাদেশ, পূর্ণাঙ্গ প্রিন্টেড ফুড ম্যাগাজিন সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি ফুড বিষয়ক একটি অ্যাপস “ফুড ভ্যান” এর উদ্ভাবন করেন তিনি। এছাড়াও করোনা কালীন সময়ে করোনা রোগীদের ঘরে বসে ট্রিটমেন্ট দেওয়ার জন্য একটি টেলিমেডিসিন অ্যাপস তৈরি করেছেন, যার নাম মেডিকা ডাইরেক্টরি। নারীদের সফল করার উদ্দেশে তিনি তার সকল প্রতিষ্ঠানে নারীদেরকেই কাজে লাগাচ্ছেন।

চাকরি না করে ব্যবসা কেন করছেন জানতে চাইলে মোরশেদা মৌরী বলেন, ‘আসলে মেয়েদের জন্য চাকরি করা যে কত কষ্টের তা আমি আমার জীবন দিয়ে বুঝেছি। সন্তান মানুষ করার পাশাপাশি চাকরি করাটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু ব্যবসা আমার নিজের, আমি আমার কাজের জন্য সবকিছু ম্যানেজ করে ঠিকই সময় বের করে ফেলতে পারি। এখানে তো কোনো সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই। তাই আমি সন্তানের যত্ন নেয়ার পাশাপাশি আমার বিভিন্ন প্রোডাক্ট রেডি করি, বাবুকে ঘুম পাড়িয়ে ব্যবসার কাজ করি। মোটকথা আমি আমার মতো করে সময়টা বের করে নিচ্ছি। যে সুযোগ চাকরিতে নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘নিজে নিজে কাজ করার পাশাপাশি কয়েকটা প্রশিক্ষণও নিয়েছি আমি। এটা খুব জরুরি। প্রশিক্ষণে অনেক বিষয় জানা যায়। ছোট ছোট ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরে নেওয়া যায়।’

নারীদের উদ্যোক্তা হতে হলে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উদ্যোক্তা হিসেবে বর্তমানে তার নিজের অবস্থান কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো আমার সন্তানের মতো। আমি নিজের অবস্থানে খুব খুশি। সবাইতো চায় তার সন্তান আরও বড় হোক, আরও নাম করুক। তেমনি আমিও চাই আমার ব্যবসায় আরও এগিয়ে যাক। আমি প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলছি পরম মমতায়। ব্যবসার মাধ্যমে যে সুনাম আমি অর্জন করেছি, তা যেন সব সময় থাকে, সেটাই আমি চেষ্টা রাখি।’

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে মৌরী বলেন, ‘নারীদেরকে উদ্যোক্তা হতে হলে অনেক নেগেটিভ কথা শুনতে হয়। বিশেষ করে প্রথম দিকে। কিন্তু সেসব শুনে পিছিয়ে পড়লে বা মন খারাপ করলে চলবে না। নিজের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে নিজের মতো করেই। ধৈর্য ধরে ভালো কাজ করে যেতে পারলে সফলতা আসবেই।’