পত্রিকার পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে অথবা চোখ কান খোলা রাখলেই বোঝা যায়, চারিদিকে শুরু হয়েছে ধর্ষণ উৎসব। এ উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে মক্তব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ থেকে রাজমহল পর্যন্ত। উৎসবে অংশগ্রহণ করছেন মানুষগড়ার কারিগর শিক্ষক, বেহেশতের টিকিট বিক্রি করা মাওলানা, বৈদেশিক মুদ্রা আহরণকারী গার্মেন্টস কর্মী, রাস্তার রাজা বাসড্রাইভার, দেশপরিচালনাকারী রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে পুলিশের কনস্টাবেল পর্যন্ত। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ রুপ নিয়েছে জাতীয় উৎসবে।

ধর্ষণকারীরা নিজেরা লুটছেন মজা, পুলিশে কামাচ্ছে টাকা, পত্রিকাওয়ালার ছাপছেন রগরগে সংবাদ, টেলিভিশন দেখাচ্ছে লাইভ সংবাদ, সাধারণ জনগন হচ্ছে আতংকগ্রস্থ, ধর্ষিতা ভোগকরছে দোজখের শাস্তি। ধর্ষিত হচ্ছে ২ বছরের শিশু থেকে ৬ সন্তানের জননী, জেগে ঘুমাচ্ছে ছাত্রসমাজ, ডাকসু ভিপি মিছিল করছেন নিজের নামে ধর্ষণ মামলার প্রতিবাদে, জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে কাঁদা ছোঁড়া ছুঁড়ি নিয়ে, খালেদা জিয়া আপোস করে আপসহীন নেত্রীর তকমা হারিয়ে অপেক্ষা করছেন বিদেশ যাত্রার, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের হিসাব মিলাচ্ছেন সরকারীদল আওয়ামীলীগ, মন্ত্রীত্ব না পাবার হতাশায় হতাশ বামদলগুলি, ক্লান্তিময় জীবনে একটু শান্তির পরশের আশায় সিরিয়াল ধর্ষণে মেতে আছেন রুস, মজনু নামের পুরুষেরা।

ধর্ষিতার আত্মচিৎকারে প্রকম্পিত পৃথিবীতে এসে ধর্ষণের বিচার করেগেলেন স্বয়ং পৌরনিক দেবতা হারকিউলিস। বিধিবাম, দেবতা করলেন ভুল, ভুলের মাসুল দিলেন ২ জন নিরীহ মানুষ (মতান্তরে ধর্ষক), যার একজনের হবার কথা ছিলো ইঞ্জিনিয়ার, দ্বিতীয় ঈশ্বরখ্যাত ডাক্তার মেডিকেল রিপোর্ট দিলেন ধর্ষণের কোন ঘটনাই ঘটে নাই। তাহলে ভুলটা করলেন কে? দেবতা হারকিউলিস নাকি দ্বিতীয় ঈশ্বর! । আসলে ভুলটা করছি আমরা সাধারণ জনগন, আমাদের উচিৎ চোখে কাঠের চশমা লাগানো, তাহলে দেখতে হবে না ধর্ষিতার লজ্জিত কষ্টের মুখ বা ধর্ষকের পৌরুষদীপ্ত বিজয়ের হাঁসিমাখা কুৎসিত।

চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, নম্বর বেশী পাইয়ে দেবার শর্তে ধর্ষণ করছেন মাধ্যমিকের শিক্ষকরা, লালশাড়ী পরিয়ে বধু করার স্বপ্ন দেখিয়ে ধর্ষণ করছেন উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষকরা, এটেনডেন্স, ক্লাসটেস্ট, টার্ম পেপারের সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে যারা ধর্ষণ করছেন তাদের নাম মুখে আনতে মানা কারন তাঁরা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করতে থানায় গিয়ে পুলিশ সদস্য কর্তৃক দ্বিতীয়বার ধর্ষণ হচ্ছে হতভাগিনীরা। ইসলামী জলসায় সারারাত জেনা করার ইহকাল পরকালের শাস্তির বয়ান করে সকালে এসে নিজেই ধর্ষণ করছেন দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়া কোন কোরআন পড়–য়া শিক্ষার্থীকে। দিনের পর দিন একই গার্মেন্টেসে পাশাপাশি কাজ করা সহকর্মীরা দলবেধেঁ ধর্ষণ করছেন অভাবের তাড়নায় বাড়ীতে বাপ মা রেখে আসা কোন সহজ সরল গ্রাম্য কিশোরীকে। চলন্ত বাসে ধর্ষণের খবর দেখে উত্তেজিত হয়ে হেলপারকে সাথে নিয়ে একাজে যোগদিচ্ছেন হচ্ছেন লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার। এ যেন ধর্ষণের এক মহাউৎসব চলছে।

শুধু লালসা নয়, প্রতিশোধের শিকার হয়েও ধর্ষিত হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধা সবাই। দলীয় প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার অপরাধের শাস্তি দলীয় ধর্ষণ, জায়গাজমি দখলমুক্ত করতে দরকার ধর্ষণ, সংখ্যালঘুর সুন্দরী কিশোরীর উচ্ছলতার শাস্তি ধর্ষণ, মোল্লাবাড়ীর কলেজপড়–য়া মেয়ে বোরখা পরলেও ধর্ষণ করছে হয়তো কোন শেখ বাড়ী বা খন্দকার বাড়ীর তেজীপুরুষ।

ধর্ষিতার ছবি ছাপা হচ্ছে পত্রিকার প্রথম পাতার প্রথম কলামে, ঠুকরে কেঁদে কেঁদে টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে ধর্ষিতার মা বা বোন, ধর্ষিতার পক্ষে যখন মিছিল করছে অবুঝ জনতা তখন পুলিশ অফিসার কালো চশমা চোখে দিয়ে বলছেন যথাযথ তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। আশায় বুক বাঁধে ধর্ষিতার মা, হতাশায় নিমজ্জিত হয় ধর্ষিতার জীবন, নতুন করে ধর্ষক আবার মত্ত হয় তার পৌরুষত্বর প্রমান দিতে। তখন মনে মনে গুন গুনিয়ে গাইতে ইচ্ছা হয় তবুও জীবন যাচ্ছে চলে জীবনের নিয়মে।

ধর্ষণ হচ্ছে আল্লাহর ঘর মসজিদে, নবীর ঘর মাদ্রাসায়, দেবতাদের উপসানালয় মন্দিরে, সুরক্ষিত ক্যান্টনমেন্টে, জেলা প্রশাসক যৌন সুর সুরি দিয়ে এসএমএস করে নির্বাহী ম্যাজিষ্টেটকে, খবর রটেছিলো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী যৌন লালসা মিটানোর জন্য মধ্যরাতে দরজায় ঠক ঠক করেছিলেন পররাষ্ট্র ক্যাডারের উর্ধ্বতন নারী কর্মকর্তাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফিল্ড ওয়ার্কের নাম করে সিনেমা হলে গিয়ে ছাত্রীর গায়ে হাত দিচ্ছেন অবলীলায়, জন্মদিনের পার্টিতে দাওয়াত দিয়ে যৌন আপ্যায়ন করাচ্ছেন স্বর্ণব্যবসায়ীর পুত্র, গ্রাম থেকে দুমুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকার আশায় ঢাকা আসা গ্রাম্য কাজের মেয়েকে ধর্ষণ করছেন সচিবলায়ের বড় কর্মকর্তা কিংবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, মধ্য আকাশে যৌন উত্তেজনায় পাইলট ঝাপিয়ে পড়ছে সহকর্মী কো পাইলট বা সুন্দরী বিমান বালার উপর। এ মহাযজ্ঞ চলছে আকাশ থেকে সাগরে, গ্রাম থেকে শহরে, যোগ দিয়েছে চৌকিদার থেকে অফিসার, আমলা থেকে কামলা।

হাইকোর্ট স্বউদ্যোগে রুল জারি করছেন কেন বুড়িগঙ্গার তীর উচ্ছেদ অবৈধ হবে না, কেন ক্ষতি পুরণ পাবে না বাস চাপায় পা হারানো হতভাগ্য হেলপার, কিন্তু রুল জারি করছেন না, বা কোন উকিল কোন রীট দাখিল করছেন না “কেন ধর্ষণকারীর পুংলিঙ্গ কেটে ঝুলিয়ে রাখ হবে না গুলিস্থানের নূর হোসেন চত্বরে”। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে স্বাধীনতার শতভাগ স্বাধীনতা ভোগ করছেন স্বাধীনচেতা ধর্ষকরা। হচ্ছে নতুন নতুন আইন, বের হচ্ছে বড় বড় ফাঁক ফোকর, পুলিশের তালিকায় নিখোজ ধর্ষক ঘুরে বেড়াচ্ছে বুকের পাটা ৪৮ ইঞ্চি করে।

ইচ্ছামতো করা হচ্ছে ধর্ষণ, ধর্ষণ সহজ আর আরামদায়ক করার জন্য কেটে বড় করা হচ্ছে ছোট্র শিশুটির যৌনাংগ। ধর্ষিতার কষ্টের মুখখানা দেখে সমাজ যেন জাগ্রত হতে না পারে তার জন্য ধর্ষিতাকে করা হচ্ছে খুন। যৌন হয়রানীর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য যৌন হয়রানীর শিকার কোমলমতী শিক্ষার্থীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেওয়া হচ্ছে আগুন। ধর্ষণ মামলার আসামী হয়ে যাচ্ছেন মহান জাতীয় সংসদের মহান নেতা, তৈরী করছেন নারী সুরক্ষা আইন।

ধর্ষক যদি হয় কোন জুয়েলারীর মালিক তাহলে পুলিশ হামলে পড়ে তার স্বর্ণের চালানে কর ফাঁকির গন্ধ খুঁজতে, বাস ড্রাইভার ধর্ষক হলে দেখা হয় তার বাসের হালনাগাদ কাগজপত্র আছে কিনা, শিক্ষক যখন ধর্ষণ করে তখন বলা হয় এটা পরিচালনা পরিষদের অন্তর্কোন্দল, ঘটনা যাই হোক মজা লুটছে ধর্ষক, চিৎকার করছে ধর্ষিতা, কাঠের চশমা পরেছে প্রশাসন, রসাতলে গেছে সমাজ ব্যাবস্থা, ভেঙ্গে পড়েছে মানবতা শুধু বেড়েছে যৌনসক্ষমতা। বন্ধ করতে হবে উৎসবের নামের বিভৎসতা, ফিরিয়ে আনতে হবে মানবতা, গড়তে হবে সোনার বাংলা।

লেখক : মো. হেদায়েত উল্লাহ তুর্কী, সহকারী রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়